রোজা রেখে যেসব কাজ করা যাবে না

রমজানে যেসব কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে

রমজান শুধু না খেয়ে থাকার মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও চরিত্র গঠনের মাস। অতএব, রোজার উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া অর্জন। কিন্তু কিছু কাজ আছে, যা রোজার সওয়াব কমিয়ে দেয়, এমনকি কবুল হওয়ার পথও সংকুচিত করে। তাই রমজানে শুধু ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করাই যথেষ্ট নয়; বরং গুনাহ থেকে বিরত থাকাই প্রকৃত সফলতা। আল্লাহ তাআলা বলেন—

Contents
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَযেসব কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে১. রোজা রেখে সারাদিন ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেওয়াنِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ২. সময় অপচয় করাوَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ৩. গালিগালাজ, গিবত, মিথ্যা ও তর্ক করাمَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُفَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلَا يَرْفُثْ وَلَا يَصْخَبْ৪. ইফতারের পর হারাম কাজে লিপ্ত হওয়াوَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ৫. অস্বাস্থ্যকর ও অতিরিক্ত খাবার খাওয়াمَا مَلَأَ آدَمِيٌّ وِعَاءً شَرًّا مِنْ بَطْنٍ৬. অজুহাত দেখিয়ে রোজা না রাখাفَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ৭. রাগ করা বা তীব্র মেজাজ দেখানোلَا تَغْضَبْ৮. নামাজ না পড়ে সারাদিন রোজা রাখাإِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَوْقُوتًاالعَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ، فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৮৩)

যেসব কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে

১. রোজা রেখে সারাদিন ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেওয়া

রোজা ইবাদতের মাস। কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া ও নামাজে সময় ব্যয় করার মাস। সারাদিন অলসতায় ঘুমিয়ে কাটালে রোজার আসল উদ্দেশ্য নষ্ট হয়। রমজানের অবসর সময় ইবাদতে না লাগিয়ে ঘুমে নষ্ট করা সত্যিই ক্ষতির কারণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ

‘দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত—সুস্থতা ও অবসর।’ (বুখারি ৬৪১২)

২. সময় অপচয় করা

অযথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম স্ক্রোল করা, টিভি দেখা, অনর্থক আড্ডা দেওয়া—এসব রমজানের বরকত নষ্ট করে। মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো—সে অর্থহীন কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ

‘আর যারা অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকে।’ (সুরা আল-মুমিনুন: আয়াত ৩)

৩. গালিগালাজ, গিবত, মিথ্যা ও তর্ক করা

রোজা শুধু খাবার থেকে বিরত থাকার নাম নয়; জিহ্বাকেও সংযত রাখতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ

‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কাজ পরিত্যাগ করে না, তার খাবার ও পানীয় ত্যাগে (রোজা রাখায়) আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (বুখারি ১৯০৩)

আরেক হাদিসে এসেছে—

فَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلَا يَرْفُثْ وَلَا يَصْخَبْ

‘তোমাদের কেউ রোজা রাখলে সে যেন অশ্লীল কথা না বলে ও ঝগড়া না করে।’ (বুখারি ১৮৯৪, মুসলিম ১১৫১)

৪. ইফতারের পর হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া

সারাদিন রোজা রেখে ইফতারের পর সিগারেটসহ হারাম পাণীয় গ্রহণ ও কাজে লিপ্ত হওয়া রোজার আত্মাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। হারাম ভক্ষণ বা ক্ষতিকর অভ্যাস রোজার মূল উদ্দেশ্যকে দুর্বল করে দিতে পারে। আল্লাহ বলেন—

وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ

‘তোমরা নিজেদের ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৯৫)

৫. অস্বাস্থ্যকর ও অতিরিক্ত খাবার খাওয়া

রোজা সংযম শেখায়। অথচ অনেকেই ইফতারে অতিরিক্ত ও অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

مَا مَلَأَ آدَمِيٌّ وِعَاءً شَرًّا مِنْ بَطْنٍ

‘মানুষ পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট পাত্র আর ভরেনি।’ (তিরমিজি ২৩৮০)

৬. অজুহাত দেখিয়ে রোজা না রাখা

পরীক্ষা, পড়াশোনা বা দুনিয়াবি কাজের অজুহাতে রোজা না রাখা গুরুতর বিষয়। শরিয়ত নির্ধারিত বৈধ ওজর ছাড়া রোজা ত্যাগ করা বড় গুনাহ। আল্লাহ বলেন—

فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ

‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস পাবে, সে যেন রোজা রাখে।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৮৫)

৭. রাগ করা বা তীব্র মেজাজ দেখানো

রোজা অবস্থায় রাগ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

لَا تَغْضَبْ

‘রাগ করো না।’ (বুখারি ৬১১৬)

৮. নামাজ না পড়ে সারাদিন রোজা রাখা

নামাজ ইসলামের স্তম্ভ। রোজা রাখলেও যদি ফরজ নামাজ আদায় না করা হয়, তাহলে বড় ফরজ ত্যাগ করা হয়। অতএব, নামাজ ছাড়া রোজা পূর্ণতা পায় না। আল্লাহ বলেন—

إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَوْقُوتًا

‘নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্ধারিত সময়ের ফরজ।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১০৩)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

العَهْدُ الَّذِي بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمُ الصَّلَاةُ، فَمَنْ تَرَكَهَا فَقَدْ كَفَرَ

‘আমাদের ও তাদের (কাফিরদের) মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ; যে তা ত্যাগ করল, সে কুফরি করল।’ (তিরমিজি ২৬২১, নাসাঈ ৪৬৩)

রমজান আমাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মাস। শুধু না খেয়ে থাকা নয়, বরং গুনাহ থেকে ফিরে আসা, চরিত্রকে শুদ্ধ করা, সময়কে মূল্যবান করা—এসবই রোজার প্রকৃত শিক্ষা। আসুন, আমরা এমন রোজা রাখি— যা আমাদের তাকওয়া বৃদ্ধি করবে, আমল শুদ্ধ করবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি এনে দেবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের রমজানকে কবুল করুন, গুনাহ মাফ করুন এবং প্রকৃত মুত্তাকি বানিয়ে দিন। আমিন।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *