খামেনির উত্তরসূরি কে হচ্ছেন, কাদের নাম শোনা যাচ্ছে

মোজতবা খামেনি (ডান দিকে) তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দ্বিতীয় ছেলে। ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর তিনি তেহরানে হিজবুল্লাহর একটি অফিস পরিদর্শন করেন

সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের শাসনব্যবস্থাকে এখন তাঁর উত্তরসূরি খুঁজতে হবে। গতকাল শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় আলী খামেনি নিহত হয়েছেন।

প্রায় চার দশক ধরে কঠোর হাতে দেশ শাসন করা এই প্রবীণ নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো উত্তরসূরির নাম ঘোষণা করে যাননি। ফলে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব পড়বে ৮৮ জন জ্যেষ্ঠ আলেমের সমন্বয়ে গঠিত নির্বাচিত সংস্থা—‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’-এর ওপর।

১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই ধর্মীয় পরিষদ মাত্র একবারই এ দায়িত্ব পালন করেছে। তিন দশকের বেশি আগে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর তড়িঘড়ি করে আলী খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছিল।

তবে এখন আদৌ এই পরিষদ বৈঠকে বসার ঝুঁকি নিতে পারবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরান সরকারকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।

সংবিধানে নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞ আলেমদের কাউন্সিলকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করতে হবে। নতুন নেতাকে অবশ্যই পুরুষ হতে হবে, ধর্মীয় আলেম হতে হবে এবং তাঁর মধ্যে রাজনৈতিক দক্ষতা, নৈতিক কর্তৃত্ব ও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি অটল আনুগত্য থাকতে হবে।

পরিষদ চাইলে বিধিবিধানের ব্যাখ্যা এমনভাবে দিতে পারে, যাতে বৃহত্তর সামাজিক স্বাধীনতা ও বিশ্বের সঙ্গে সম্পৃক্ততার পক্ষে থাকা সংস্কারপন্থী আলেমরা এই প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়েন।

বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মতামতের ভিত্তিতে সম্ভাব্য কয়েকজন প্রার্থীর কথা জানতে পেরেছে সিএনএন। তাঁদের নিয়ে এখানে আলোচনা করা যাক—

ইরানের ইসলামি সেমিনারির সভাপতি আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি এবং তাঁর সফরসঙ্গীরা ২০২২ সালের ৩০ মে ভ্যাটিকানে পোপ ফ্রান্সিসকে একটি উপহার দিচ্ছেন

মোজতবা খামেনি (৫৬)

সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির দ্বিতীয় ছেলে মোজতবা খামেনি পর্দার আড়ালে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করেন বলে মনে করা হয়। দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং এর স্বেচ্ছাসেবী আধা সামরিক বাহিনী বাসিজের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

তবে বাবা থেকে ছেলের কাছে নেতৃত্ব হস্তান্তর শিয়া মুসলিম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ভালো চোখে দেখা হয় না; বিশেষ করে এমন এক বিপ্লবোত্তর ইরানে। এ দেশে একসময় ব্যাপকভাবে সমালোচিত রাজতন্ত্র উৎখাত করে এই ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

আরেকটি বড় বাধা হলো, মোজতবা উচ্চপদস্থ আলেম নন এবং সরকারে তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক পদও নেই। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

আলিরেজা আরাফি (৬৭)

তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত হলেও আলিরেজা আরাফি একজন প্রতিষ্ঠিত আলেম। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। তিনি সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ বলেও পরিচিত।

বর্তমানে আরাফি অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি প্রভাবশালী গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। এই সংস্থাটি নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই এবং পার্লামেন্টে পাস হওয়া আইন যাচাই–বাছাই করে। পাশাপাশি তিনি ইরানের কওমিভিত্তিক ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থারও প্রধান।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের অ্যালেক্স ভাতাঙ্কার মতে, আরাফিকে গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সংবেদনশীল পদে নিয়োগ দেওয়া থেকে বোঝা যায়, তাঁর প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর খামেনির গভীর আস্থা রয়েছে।

তবে আরাফি রাজনৈতিকভাবে খুব শক্তিশালী বা প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত নন এবং নিরাপত্তাকাঠামোর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও নেই।

ভাতাঙ্কা আরও উল্লেখ করেছেন, আরাফি আরবি ও ইংরেজিতে সাবলীল, প্রযুক্তিবান্ধব। তিনি ২৪টি বই ও প্রবন্ধ রচনা করেছেন।

মোহাম্মদ মেহদি মিরবাঘেরি

মিরবাঘেরি কট্টরপন্থী আলেম এবং অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সদস্য। বয়স ৬০–এর কাছাকাছি। তিনি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে রক্ষণশীল ধারার প্রতিনিধিত্ব করার জন্য বলে পরিচিত।

অ্যাকটিভিস্টভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরানওয়্যারের তথ্য অনুযায়ী, মিরবাঘেরি পশ্চিমা বিশ্বের ঘোরবিরোধী। তিনি বিশ্বাস করেন, বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের মধ্যে সংঘাত অবশ্যম্ভাবী। বর্তমানে তিনি উত্তরাঞ্চলের পবিত্র শহর কুমে অবস্থিত ইসলামিক সায়েন্সেস একাডেমির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

হাসান খোমেনি

হাসান খোমেনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি। এটি তাঁকে ধর্মীয় ও বিপ্লবী বৈধতা দিয়েছে বলে মনে করা হয়। তাঁর বয়স ৫০–এর কোঠায়।

খোমেনির সমাধিস্থানের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করেন হাসান। তবে কোনো সরকারি পদে তিনি নিযুক্ত নন। দেশের নিরাপত্তাকাঠামো বা শাসকদের সঙ্গে তাঁর প্রভাব সীমিত বলে মনে করা হয়। তিনি অনেক সহকর্মীর তুলনায় কম কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত। ২০১৬ সালে তাঁকে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসে প্রার্থী হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

হাসান খোমেনি, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি। ২০২৫ সালের ৪ জুন তেহরানের দক্ষিণ অংশে অবস্থিত খোমেনির সমাধিস্থলে (ইমাম খোমেনি মাউসমোলিয়াম) যান তিনি

হাশেম হোসেইনি বুশেহরি

বুশেহরি একজন জ্যেষ্ঠ আলেম, যিনি উত্তরাধিকার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, বিশেষ করে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সঙ্গে। এই সংস্থায় তিনি প্রথম ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বয়স ৬০–এর কাছাকাছি।

বুশেহরি খামেনির নিকটজন ছিলেন বলে জানা যায়। তবে দেশে তাঁর পরিচিতি কম। আবার আইআরজিসির সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক আছে, তেমনটাও নয়।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *