দাদী থেকে “ম্যাডাম”: গণতন্ত্রের মা,তাকে নিয়ে আমার যাত্রা

দাদী থেকে “ম্যাডাম”: গণতন্ত্রের মা,তাকে নিয়ে আমার যাত্রা
শৈশবে আমি কখনো বুঝতে পারিনি, ইতিহাসের কত বিশাল বোঝা আমার ঠিক পাশে নীরবে বসে ছিলেন৷ আমার কাছে তিনি ছিলেন শুধু দাদী, সেই কোমল, মমতাময়ী নারী, যাকে ঈদের দিনে বাবা আমাকে নিয়ে যেতেন দেখা করতে৷ আমি যখন ই রুমে ঢুকতাম, তিনি সেই মৃদু, স্নিগ্ধ হাসি দিতেন যে হাসি শুধু প্রকৃত মায়েরাই দিতে পারেন। বাবার গভীর শ্রদ্ধা ও অনুরাগের মধ্য দিয়ে তিনি আমার শৈশব স্মৃতির অপরিহার্য এক অংশ হয়ে উঠেছিলেন।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে বুঝতে শুরু করলাম তিনি আসলে কে৷ বেগম খালেদা জিয়া— গণতন্ত্রের মা৷
অন্ধকার সময়ের আলো, মানুষের অধিকারের রক্ষক। নির্যাতনের বিরুদ্ধে অটল সাহসী এক যোদ্ধা। যাকে আমি দাদী বলে ডাকতাম, তিনি-ই আবার সেই নারী, যিনি একটি জাতির স্বপ্ন, সংগ্রাম ও আশা নিজের কাঁধে বহন করেছেন।
বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে, দেশে ফিরে এসে যখন দ্বিধায় ছিলাম জীবন কোনদিকে নিয়ে যাবে তখন আবার ওনার সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি আমাকে গর্বভরে দেখে বলেছিলেন, “ভালো— আমাদের দলে আরেকজন যোগ হলো”। সেই মুহূর্তে আমি তাঁর স্নেহের সঙ্গে অনুভব করেছিলাম তাঁর বিশ্বাস আর আশীর্বাদ।
তারপর এলো আমার বিয়ের দিন। বাবা আর আমি তাঁকে আমন্ত্রণ জানালাম, দ্বিধায় ছিলাম, ভাবছিলাম হয়তো তাঁর ব্যস্ততা ও বিভিন্ন দাইত্ব পালনের মাঝে ও তিনি আসবেন। আর তিনি এলেন। সেই শান্ত, মহৎ হাসি নিয়ে। তাঁর আগমন যেন পুরো ঘরটিকে আলোকিত করে তুলল। আমি কাছে গিয়ে বলেছিলাম, “আপনি এসেছেন, বিশ্বাসই করতে পারছি না…” আর তিনি দিলেন সেই চিরচেনা নরম, মধুর হাসি। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে বাংলাদেশের সাবেক তিন বারের প্রধানমন্ত্রী আমার বিয়েতে এসেছেন এবং আমর পাশে বসেছেন৷
আমরা তাদের ই মধ্যে অল্প কয়েকজন সৌভাগ্যবান মানুষ, যাদের জীবনে তিনি শুধু আমার নয়, আমার বাবার বিয়েতেও উপস্থিত ছিলেন—দুটি প্রজন্মই তাঁর উপস্থিতির ছোঁয়ায় ধন্য হয়েছে। এটি আমার জীবনের সবচেয়ে অবিস্মরণীয় আশীর্বাদগুলোর একটি হয়ে থাকবে।
বছর গড়াতে গড়াতে আমি রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হয়ে উঠলাম— মিটিং, মিছিল, রাস্তায় স্লোগান। আর তখনই পল্টানের আকাশে গর্জে উঠত –“খালেদা…. জিয়া..!” প্রতিটি স্লোগান তাঁর তৈরি ঐতিহ্যের প্রতিধ্বনি, সাহস, ত্যাগ আর জনগণের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসায় লেখা এক ইতিহাস।
ধীরে ধীরে আমি তাঁকে দাদী বলে ডাকা থামিয়ে দিলাম। দলের অন্য সবার মতো আমিও তাঁকে ডাকতে লাগলাম ম্যাডাম- ভক্তি, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং অটল আনুগত্য নিয়ে।
যখন তিনি অন্যায়ভাবে, মিথ্যা ও সাজানো অভিযোগে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের হাতে কারাবন্দী হলেন আমি হাজারো মানুষের সঙ্গে তাঁর মুক্তির দাবিতে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম। আর ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর, যেদিন আমার বাবার মুক্তি মিলল, আমরা একসঙ্গে ওনাকে দেখতে গেলাম হাসপাতালে। তিনি হাসলেন স্বস্তির সঙ্গে, কিন্তু কারাগারে ধীরে ধীরে বিষপ্রয়োগের কারণে দৃশ্যত দুর্বল। তাঁর চোখে ছিল অসীম কষ্ট, কিন্তু অটল, অবিচল একটি আত্মা। তিনি পাহাড়সম যন্ত্রণা সয়েছেন কিন্তু তাঁর মনোবল ছিল লোহার মতো দৃঢ়।
যখন বহু বছরের নিষ্ঠুর ও জোর করে বিচ্ছিন্ন করে রাখার পর তিনি পরিবারকে দেখার জন্য লন্ডনে রওনা হলেন, আমি ছিলাম সে সব মানুষের মধ্যে যারা তাঁকে বিদায় জানাতে গিয়েছিলেন | আমরা দাঁড়িয়েছিলাম সেই নারীর পাশে, যিনি দশকের পর দশক ধরে জাতিকে এক করেছেন৷
আর এখন, তিনি যখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন,পুরো দেশ প্রার্থনায় মুখর। তাঁর জন্য দেশজুড়ে ভালোবাসা, অশ্রু আর আশার ঢেউ প্রমাণ করে তিনি এই জাতিকে কতটা দিয়েছিলেন। তিনি আমাদের আপসহীন নেত্রী ঐক্যের প্রতীক ও গণতন্ত্রের মা৷
আমার কাছে তিনি এসবের চেয়েও অনেক বেশি।
শিশুর নিষ্পাপ চোখে প্রথম দেখা এক নারী।
হৃদয়ের গভীরে থাকা এক দাদী। চেতনার ভিত্তি হয়ে ওঠা এক আপোষহীন নেত্রী৷ আমার রাজনৈতিক পথচলার আলোকবর্তিকা।
আজ, একজন দলীয় কর্মী হিসেবে, এবং একজন সাবেক এবং ভবিষ্যৎ এমপি প্রার্থী হিসেবে তাঁর শিক্ষা বুকে ধারণ করে আমি একটি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি:
তিনি যা গড়েছেন, তা রক্ষা করব।
তাঁর আদর্শ বহন করব।
তিনি যেই গণতন্ত্রের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, তা রক্ষায় অটল থাকব।
কারণ তিনি ছিলেন, আছেন, এবং চিরকাল থাকবেন আমার, আমাদের, আর জাতির “ম্যাডাম”—গণতন্ত্রের মা৷
আর তাঁর সেই ঐতিহাসিক পথচলার সামান্য একটি অংশের সঙ্গী হতে পেরেছি এবং পারছি এই গর্ব আর কৃতজ্ঞতা আমি আজীবন বয়ে নিয়ে চলব।
ব্যারিস্টার ইরফান ইবনে আমান অমি
সাংগঠনিক সম্পাদক, ঢাকা জেলা বিএনপি৷
ব্যারিস্টার ইরফান ইবনে আমান অমির ফেসবুক থেকে নেয়া
Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *