প্রশ্ন: ভুলে সময়ের আগে ইফতার করলে কী করবেন? এতে কি রোজা ভেঙে যাবে? রোজা ভেঙে গেলে শুধু কাজা করলেই হবে নাকি কাফফারাও দিতে হবে? আবার অনেকে সময়ের পরে সেহরি খায়, তাদের রোজা হবে কি?
রমজান মাসে রোজা পালন মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরজ ইবাদত। রোজা রাখার ক্ষেত্রে সময়ের সঠিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকাই রোজার মূল শর্ত। তবে অনেক সময় মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, সময় সম্পর্কে ভুল ধারণা কিংবা অন্য কারণে কেউ সূর্যাস্ত হয়ে গেছে মনে করে ভুলবশত ইফতার করে ফেলতে পারেন। তখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে— এ অবস্থায় রোজার হুকুম কী হবে? এ রোজা কি ভেঙে যাবে? আবার কাফফারা দিতে হবে কি না—এসব বিষয় ইসলামী ফিকহে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
ভুলে সময়ের আগে ইফতার করলে করণীয়
ভুল করে কেউ যদি সময়ের আগে ইফতার করে ফেলে— অর্থাৎ রোজার কথা মনে থাকা অবস্থায়ই সূর্যাস্ত হয়ে গেছে মনে করে সূর্যাস্তের আগেই কিছু খেয়ে ফেলে—তাহলে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী তার রোজা ভেঙে যাবে।
তবে যেহেতু এটি ভুলবশত হয়েছে, তাই এর কারণে তার গুনাহ হবে না। কিন্তু রোজা ভেঙে যাওয়ার কারণে তাকে রমজানের পর শুধু ওই দিনের রোজা কাজা করতে হবে, কাফফারা দিতে হবে না।
এ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকেও প্রমাণ পাওয়া যায়। হাদিসে এসেছে—
عَنْ عَلِيِّ بْنِ حَنْظَلَةَ عَنْ أَبِيهِ قَالَ: كُنْتُ عِنْدَ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ فِي رَمَضَانَ فَأُتِيَ بِشَرَابٍ، فَشَرِبَ بَعْضُ الْقَوْمِ، ثُمَّ قَالَ الْمُؤَذِّنُ: يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ! لَمْ تَغِبِ الشَّمْسُ، فَقَالَ عُمَرُ: الَّذِينَ شَرِبُوا فَلْيَقْضُوا يَوْمًا
হজরত আলী ইবনে হানজালা তার বাবা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রমজানের একদিন ইফতারের সময় হজরত ওমর (রা.)-এর কাছে ছিলেন। তখন পানীয় আনা হলে উপস্থিতদের কেউ কেউ সূর্য ডুবে গেছে মনে করে তা পান করে ফেলল। এরপর মুয়াজ্জিন বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনিন! সূর্য এখনো ডোবেনি।’ তখন ওমর (রা.) বললেন, ‘যারা পান করেছে তারা একটি রোজা কাজা করবে।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ৯১৩৮)
- রমজানের মধ্যে ফিতরা দেওয়া যাবে কি?
সেহরি খেয়ে মুখে পান রেখে ঘুমালে কি রোজা হবে?
তারাবিহ নামাজের জামাত না পেলে বা সন্ধ্যায় পড়তে না পারলে কী করবেন?
এ অবস্থায় কাফফারা লাগবে কি?
এ বিষয়ে তাবেয়ি আলেমদের মতামতও স্পষ্ট। হজরত ইবনে জুরাইজ (রহ.) বলেন—
قُلْتُ لِعَطَاءٍ: أَفْطَرْتُ فِي يَوْمٍ مِنْ رَمَضَانَ فِي يَوْمٍ غَيْمٍ ثُمَّ طَلَعَتِ الشَّمْسُ، أَعَلَيَّ قَضَاءٌ أَمْ كَفَّارَةٌ؟ قَالَ: عَلَيْكَ الْقَضَاءُ
আমি আতা (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘রমজানের এক মেঘাচ্ছন্ন দিনে সময় হয়েছে মনে করে ইফতার করেছি, পরে সূর্য দেখা গেল। এখন কি শুধু কাজা করব নাকি কাফফারাও দিতে হবে?’ তিনি বললেন, ‘শুধু কাজা করলেই হবে।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ৯১৪৭)
সুবহে সাদিকের পর ভুল করে সেহরি খেলে
একইভাবে কেউ যদি রাত বাকি আছে মনে করে সুবহে সাদিক হওয়ার পর সেহরি খেয়ে ফেলে, তাহলে সেই রোজাও শুদ্ধ হবে না। এ ক্ষেত্রে রমজানের পর ওই দিনের রোজা কাজা করতে হবে, তবে কাফফারা দিতে হবে না।
এ প্রসঙ্গে একটি বর্ণনা রয়েছে—
عَنْ عَوْنٍ قَالَ: تَسَحَّرَ مُحَمَّدُ بْنُ سِيرِينَ يَظُنُّ أَنَّ اللَّيْلَ بَاقٍ، فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ أَنَّهُ بَعْدَ الْفَجْرِ قَالَ: لَسْتُ الْيَوْمَ بِصَائِمٍ
হজরত আউন (রহ.) থেকে বর্ণিত, মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন (রহ.) রাত বাকি আছে মনে করে সেহরি খেলেন। পরে জানতে পারলেন তিনি সুবহে সাদিকের পর সেহরি করেছেন। তখন তিনি বললেন, ‘আমি আজ রোজাদার নই।’ অর্থাৎ সেই রোজাটি শুদ্ধ হয়নি এবং পরে তা কাজা করতে হবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, ৬/১৪৯)
ইসলামে রোজা পালনের ক্ষেত্রে সময়ের সঠিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভুলবশত সময়ের আগে ইফতার করা বা সুবহে সাদিকের পর সেহরি খেয়ে ফেলার মতো ঘটনা ঘটলে ইসলাম এতে মানুষের ওপর কঠোরতা আরোপ করেনি। এ ধরনের ভুলে গুনাহ হয় না, কিন্তু যেহেতু রোজার শর্ত পূর্ণ হয়নি, তাই সেই দিনের রোজা পরে কাজা করতে হয়। তবে এতে কাফফারা আবশ্যক নয়। তাই রোজার সময়সূচি সম্পর্কে সতর্ক থাকা এবং নির্ভরযোগ্য সময় অনুযায়ী সেহরি ও ইফতার করা প্রত্যেক রোজাদারের জন্য জরুরি।


