রাজশাহীবাসীর ৭৪ বছরের প্রতীক্ষার অবসান, প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা

রাজশাহীতে একুশের প্রথম প্রহরেই পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে উদ্বোধন হয় নবনির্মিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। গতকাল শুক্রবার রাতে

৭৪ বছর পর প্রথমবারের মতো নিজস্ব কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ পেলেন রাজশাহীবাসী। একুশের প্রথম প্রহরেই পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে উদ্বোধন হয় নবনির্মিত এ স্থাপনার। এর পর থেকেই মানুষের ঢলে মুখর হয়ে ওঠে নগরের বোয়ালিয়া এলাকার সোনাদীঘির পশ্চিম পাশের প্রাঙ্গণ।

বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ দলে দলে এসে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। অনেকে খালি পায়ে নীরবে দাঁড়িয়ে স্মরণ করেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারদের আত্মত্যাগ।

রাজশাহী উদীচী সকালে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে। সংগঠনটির সভাপতি জুলফিকার আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ছিল—রাজশাহীতে একটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হবে। অনেক প্রগতিশীল ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ আন্দোলন করেছেন। অবশেষে সেটি বাস্তবায়িত হয়েছে। এবার মানুষের সমাগমও অন্যবারের চেয়ে বেশি।

প্রথম আলো বন্ধুসভার রাজশাহী জেলা শাখাও প্রভাতফেরি করে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে আসে। কুমারপাড়া কার্যালয় থেকে যাত্রা শুরু করে তারা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। বন্ধুসভার সভাপতি সোহান রেজা বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের ৭৫ বছর পূর্তির প্রাক্কালে রাজশাহী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পেল। ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ মিনারও স্থাপিত হয়েছিল রাজশাহী কলেজে। দীর্ঘ আন্দোলনের পর এই অর্জন আমাদের জন্য গর্বের।’

সকাল ৯টার আগে শহীদ মিনারে আসেন রাজশাহীর একদল বীর মুক্তিযোদ্ধা। পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের পর তাঁরা ভাষাশহীদদের স্মৃতিচারণা করেন। পরে সেখানে দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবুল হোসেন খন্দকার বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন না হলে স্বাধীনতার বীজ বপন হতো না। নতুন এই শহীদ মিনারে এসে শ্রদ্ধা জানাতে পেরে ভেতরে এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছে।

নবনির্মিত শহীদ মিনারটি রাজশাহী জেলা পরিষদের জায়গায় ৭ কোটি ৮০ লাখ ১৬ হাজার ৫৮০ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে। নগরের প্রাণকেন্দ্রে ৬২ শতাংশ জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এ স্থাপনা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে নির্মিত। মূল কাঠামোতে আছে একটি বড় কেন্দ্রীয় স্তম্ভ এবং দুই পাশে দুটি করে মোট পাঁচটি স্তম্ভ। পেছনে লাল বৃত্তাকার প্রতীক।

মানুষের ঢলে মুখর হয়ে ওঠে নগরের বোয়ালিয়া এলাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রাঙ্গণ। গতকাল শুক্রবার রাতে

শহীদ মিনার নির্মাণ ঘিরে জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে পাঁচ বছর আগে টানাপোড়েন শুরু হয়। সিটি করপোরেশন ১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করলেও শেষ পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। পরে ২০২৩ সালে জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মীর ইকবাল নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন।

একুশের প্রথম প্রহরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে শহীদ মিনারের উদ্বোধন করেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান (মিনু)। এ সময় উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল হক, বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রশীদ, জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

জেলা পরিষদের প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, কেন্দ্রীয় বড় স্তম্ভটি শহীদদের আত্মত্যাগের মহিমা প্রকাশ করে। পাশের চারটি স্তম্ভ তাঁদের মা, ভাই, বোন ও সাধারণ মানুষের ঐক্য ও সমর্থনের প্রতীক। পেছনের লাল বৃত্ত সূর্যের প্রতীক, যা ১৯৫২ সালের রক্তাক্ত সংগ্রাম থেকে উদীয়মান নতুন চেতনার প্রতিফলন।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *