সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে সুন্দর ও সহৃদয় সমাজ গড়তে চায় ছায়ানট

সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে সুন্দর ও সহৃদয় সমাজ গড়তে চায় ছায়ানট

বিশ্বায়নের এই যুগে সংস্কৃতি কিংবা শিল্পকলার বিকাশে ডিজিটাল মাধ্যমের রয়েছে অপরিসীম গুরুত্ব। সেই বাস্তবতায় গত বছরের পয়লা ডিসেম্বর থেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যাত্রা শুরু করে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট।
আর প্রথম বছরেই ছায়ানটের ডিজিটাল প্লাটফর্ম জাগরণী কন্টেন্ট অভূতপুর্ব সারা ফেলেছে নেট দুনিয়ায়। শীর্ষ ৫ কন্টেন্ট স্পর্শ করেছে মিলিয়নস ভিউয়ের মাইলফলক। পৌঁছে গেছে অন্তর্জালের কোটি মানুষের দুয়ারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বর্ষপূর্তির সেই সাফল্য তথ্য তুলে ধরতে বৃহস্পতিবার  ধানমন্ডির ছায়ানট  ভবনে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ছায়ানটের সংগঠকরা বলেন, ধারাবাহিক সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে একটি সত্য, সুন্দর ও সহৃদয় সমাজ গড়ে  তুলতে ছায়ানট। সেই বিশ্বাস থেকেই ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছায়ানটের ব্যাপকতর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। আবহমান বাংলার সংস্কৃতির অমূল্য নিদর্শনকে মানুষের কাছে  পৌঁছে  দিতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। রমনা বটমূলে নববর্ষের প্রভাতসঙ্গীতের বার্তা যেভাবে বহু দশক ধরে মানুষকে সুর ও বাণীর আলোয় অনুপ্রাণিত করেছে, আপন সংস্কৃতি ও দেশপ্রেমে আকৃষ্ট করেছে,  তেমনই মানুষের জীবনের প্রতিটি দিন উদ্দীপনায় ভরিয়ে দিতে চায় ছায়ানট।
তারা আরও জানান, সামাজিক মধ্যম ফেইসবুকে গত এক বছরে প্রায় দেড় হাজার কন্টেন্ট প্রকাশ করেছে ছায়ানট। যার অধিকাংশ সাবস্ক্রাইবারই তরুণ সমাজ, যাদের বয়স ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
ছায়ানট নিয়মিত কন্টেন্টের পাশাপাশি বিশেষ দিবস উপলক্ষ্যে বিশেষ বিশেষ কন্টেন্ট মুক্তি দেয়। নতুন বছরে গবেষণা ও আর্কাইভধর্মী কন্টেন্ট নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে ছায়ানট।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসা। কথনে অংশ নেন প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ডা. সারওয়ার আলী, ছায়ানটের  ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম উপ-সংসদের আহ্বায়ক জয়ন্ত রায়, সহ-সভাপতি পার্থ তানভীর নভেদ এবং ডিজিটাল আরকাইভস ও প্ল্যাটফর্মের তত্ত্বাবধায়ক অনিন্দ্য রহমান।
সারওয়ার আলী সভাপতি বলেন, ছায়ানট তরুণদের ক্ষমতায়িত করার  চেষ্টা করছে, যাতে তারা দায়িত্ব নিতে পারে। গত কয়েক বছর ধরে সাংস্কৃতিক আঘাত আবারও দৃশ্যমান হচ্ছে। এর গভীরে রয়েছে আত্মপরিচয় সংকট।  সেই চিন্তা  থেকেই এই জাগরণী কন্টেন্ট তৈরি শুরু করে তারা। আমাদের  লক্ষ্য সংস্কৃতিচর্চার আশ্রয়ে উদার ও সহিষ্ণু সমাজ বিনির্মাণ করা। ছায়ানট বিশ্বাস করে ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে একটি সত্য সুন্দর ও  সুহৃদ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
লিখিত বক্তব্যে লাইসা আহমদ লিসা বলেন, ২০১৭ সালের নববর্ষের কথনে সন্জীদা খাতুন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপরিসীম শক্তি ও সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। আরও মানুষের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছায়ানটকে যুক্ত করার ভাবনা ছিল তার। সেই ভাবনাকে সঙ্গী করে আমাদের এই যাত্রা বিস্তৃৃততর হয় ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর সকাল ৯টায় ‘জাগরণী’ দিয়ে। ‘জাগরণীতে’ প্রতিদিন সকালে প্রকাশিত হয়েছে এমন গান, পাঠ-ভাবনা, যা ঘুম ভাঙার মতোই অসংখ্য মানুষের মনকে নতুন করে জাগিয়েছে, দিয়েছে শক্তি, করেছে উজ্জীবিত। মঙ্গল আর কল্যাণের যে বাণী যুগ যুগ ধরে পথ দেখাচ্ছে, উজ্জীবিত করে চলছে বাঙালিকে, প্রতি মঙ্গলবার রাতে তার সাপ্তাহিক উপস্থাপন ‘চিরন্তন’ শুরু হয় ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে।
একই সঙ্গে গুণী শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে ‘গানের নিবিড় পাঠ’, প্রকাশ করা হয় ফেসবুকে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে। ছায়ানটের এই দূরশিক্ষণ উদ্যোগটি শুধু গান শোনা নয়, মননেও পৌঁছে দেওয়ার এক প্রয়াস। গানের শব্দ, সুর, ভাব ও প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে শ্রোতার সামনে খোলা হয়েছে শিল্প-বোধের গভীরতর পথ। পাশাপাশি এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিয়মিত যুক্ত হয়েছে ছায়ানট আয়োজিত সকল অনুষ্ঠানের সরাসরি সম্প্রচার, যেন অপারগ-ইচ্ছুক মানুষেরা অংশ নিতে পারেন  শোনায়, দেখায় ও অনুভবে।
সঙ্গীতবিদ্যায়তনের প্রতি সপ্তাহের প্রতি বেলার ক্লাসে ছটি ‘সূচনা-সমাবেশ’, প্রতিটি যেন একেকটি ছোট সাঙ্গীতিক অভিযাত্রা। প্রায় প্রতি মাসের নিয়মিত আরও দুটি আয়োজন, ‘শিক্ষার্থীদের অনুষ্ঠান’ এবং সকলে মিলে সানন্দে মুক্তকণ্ঠে একাধারে গাইবার সুযোগ ‘গান অবিরাম’। যা আমাদের নবীন শিক্ষার্থীদের শিল্পচর্চার অগ্রগতি সকলের সামনে উন্মুক্ত করছে এবং ‘গান অবিরাম’ তার নিজস্ব গতিতে চলমান- ফেইসবুকে সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে হয়ে উঠেছে এক অনির্বচনীয় সঙ্গীত-প্রবাহ।
প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, এক বছর আগে ছিল শুধুই স্বপ্ন-প্রতিদিনের একটি পরিবেশনে পরিচ্ছন্ন, সংহত সংস্কৃতি অনুরাগী-শ্রোতা তৈরি করার স্বপ্ন। আজ তা দাঁড়িয়েছে এমন এক জায়গায়,  যেখানে হাজারো মানুষ নিয়মিত যুক্ত হন, শোনেন,  শেখেন ও অনুভব করেন। এই এক বছরে আমাদের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে এমন একটি পরিসর, যার ভরকেন্দ্র শিল্প, অথচ যার আলো ছড়িয়ে পড়ছে সমাজের প্রতিদিনের জীবনে। আমাদের প্রত্যাশা- ডিজিটাল জগতে এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে সৌন্দর্য, মানবতা, ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতা মিলেমিশে মানুষের মনকে নির্মল করে এবং চিন্তাকে সজাগ করে।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *