ইসলামে সন্তানকে সঠিক সময়ে সঠিক শিক্ষা দেওয়া মা–বাবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পার্থিব শিক্ষার পাশাপাশি শিশুকে ছোটবেলা থেকেই দ্বীনি শিক্ষা ও ইবাদতের প্রতি অভ্যস্ত করে তোলা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। এ বিষয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, যাতে শিশুরা ধীরে ধীরে ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর ইসলামের বিধানগুলো সহজে পালন করতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ لِسَبْعِ سِنِينَ، وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا لِعَشْرِ سِنِينَ، وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ
‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের আদেশ দাও এবং যখন তাদের বয়স দশ বছর হবে তখন নামাজের জন্য শাসন করো এবং তাদের বিছানা পৃথক করে দাও।’ (আবু দাউদ ৪৯৪)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, শৈশব থেকেই শিশুকে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি দ্বীনি শিক্ষায় অভ্যস্ত করা জরুরি, যাতে সে বড় হয়ে একজন নেক ও দায়িত্বশীল মানুষে পরিণত হতে পারে। এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— শিশুকে কত বছর বয়স থেকে রোজা রাখার শিক্ষা দেওয়া উচিত?
প্রাপ্তবয়স্ক হলে রোজা ফরজ
ফুকাহায়ে কেরামের মতে, রোজা ফরজ হওয়ার শর্ত হলো প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া। সুতরাং কোনো শিশুর মধ্যে যদি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার নিদর্শন প্রকাশ পায়, তাহলে তার ওপর রোজাসহ ইসলামের অন্যান্য ফরজ বিধান প্রযোজ্য হবে।
আর যদি ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত তার মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কোনও লক্ষণ প্রকাশ না পায়, তাহলে তখন থেকেই তাকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তার ওপর রোজা ফরজ হয়ে যাবে।
দশ বছর বয়সে রোজার অভ্যাস করানো
উপরোক্ত হাদিসের আলোকে আল্লামা আলাউদ্দিন হাসকাফি (রহ.) লিখেছেন— ‘যখন কোনো শিশু রোজা রাখার সক্ষমতা অর্জন করবে এবং তার বয়স ১০ বছরে পৌঁছাবে, তখন সহিহ মত অনুযায়ী তাকে শাসনের মাধ্যমে রোজা রাখার নির্দেশ দেওয়া হবে; যেমনভাবে নামাজের ক্ষেত্রে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সাত বছর বয়সে সক্ষমতা বিষয়ে আলেমদের মত
এ বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) লিখেছেন, কিছু ফকিহের মতে শিশুর রোজা রাখার সক্ষমতার বয়স সাত বছর। তবে তিনি বলেন, বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, সাধারণত এই বয়সে শিশুদের পক্ষে পূর্ণ রোজা রাখা কঠিন হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি মূলত শিশুর শারীরিক সামর্থ্য, স্বাস্থ্য এবং মৌসুমের ওপর নির্ভর করে—যেমন গ্রীষ্ম বা শীতকাল।
যতদিন পারবে ততদিন রোজা
বাস্তব দিক বিবেচনায় বলা হয়, শিশু যদি পুরো রমজান মাস রোজা রাখতে না পারে, তবে যতদিন সহজে রাখতে পারে ততদিনই রোজা রাখবে। তাকে দিয়ে পুরো মাসের রোজা রাখানো বাধ্যতামূলক নয়।
নাবালক শিশুর রোজা ভেঙে গেলে
আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) আরও লিখেছেন, যদি কোনও নাবালক শিশু রোজা রাখার পর কোনও ওজর ছাড়াই তা ভেঙে ফেলে, তাহলে তার ওপর সেই রোজার কাজা ওয়াজিব হবে না। (রদ্দুল মুহতার ৩/৩৪৪)
আলেমদের মতামত
শাইখুল হাদিস ও তাফসির আল্লামা গোলাম রাসুল সাঈদী (রহ.) লিখেছেন, অধিকাংশ আলেমের মতে যেসব শিশু এখনও প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি, তাদের ওপর রোজা ফরজ নয়। তবে পূর্ববর্তী অনেক আলেম প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে রাখা রোজাকে মুস্তাহাব বলেছেন।
ইবনে সিরিন ও ইমাম যুহরির মতও একই। ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর মতও কাছাকাছি। তিনি বলেন, যখন শিশু রোজা রাখার সক্ষমতা অর্জন করবে, তখন তাকে অনুশীলনের জন্য রোজা রাখতে উৎসাহিত করা উচিত।
বিভিন্ন ইমামের মত
ইমাম শাফেয়ি (রহ.)-এর অনুসারীদের মতে, রোজার বিষয়টি নামাজের মতো—সাত বছর বয়সে শিশুদের রোজা রাখতে উৎসাহিত করা এবং দশ বছর বয়সে তাদের অভ্যস্ত করে তোলা উচিত।
ইমাম ইসহাক (রহ.)-এর মতে, শিশুদের রোজা রাখার উপযুক্ত বয়স ১২ বছর।
আর ইমাম আহমদ (রহ.)-এর একটি বর্ণনা অনুযায়ী, শিশুদের রোজা রাখার বয়সসীমা ১০ বছর।
অন্যদিকে ইমাম মালিক (রহ.)-এর প্রসিদ্ধ মত হলো, শিশুদের ক্ষেত্রে রোজা শরিয়তিভাবে নির্ধারিত নয়; অর্থাৎ তাদের ওপর এটি বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
আলেমদের ঐকমত্য
আল্লামা ইবনে বাত্তাল (রহ.) বলেছেন, এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে যে ইবাদত ও ফরজগুলো কেবল প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরই বাধ্যতামূলক হয়। তবে অধিকাংশ আলেম বরকত ও অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য শিশুদের ইবাদতের অনুশীলন করানোকে উত্তম মনে করেন।
কারণ এতে তারা ছোটবেলা থেকেই ইবাদতে অভ্যস্ত হয়ে যায় এবং যখন তাদের ওপর ইবাদত ফরজ হবে, তখন তা পালন করা তাদের জন্য সহজ হয়ে যায়। আর যারা শিশুদের ইবাদতের অনুশীলন করায়, তারা এ জন্য সওয়াব লাভ করবে। (উমদাতুল কারি ৩/৯৮)
হানাফি মাজহাবের মত
মধ্যপন্থি মত এবং হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, ছেলে-মেয়েদের ওপর রোজা ফরজ হয় প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর। যদি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কোনও লক্ষণ প্রকাশ না পায়, তাহলে ১৫ বছর পূর্ণ হলে তাকে প্রাপ্তবয়স্ক ধরা হবে এবং তখন তার ওপর রোজা ফরজ হবে।
তবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেও যদি শিশুর মধ্যে রোজা রাখার শক্তি থাকে এবং এতে তার শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে, তাহলে তাকে রোজা রাখতে উৎসাহিত করা উচিত।
বিশেষ করে যখন তার বয়স ১০ বছর হবে, তখন তার সামর্থ্য অনুযায়ী রোজা রাখতে উৎসাহ দেওয়া ভালো, যাতে সে ধীরে ধীরে এতে অভ্যস্ত হয়ে যায়।
অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর রোজা ভেঙে গেলে
যদি কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু রোজা রেখে তা ভেঙে ফেলে, তাহলে তার ওপর সেই রোজার কাজা আদায় করা আবশ্যক নয়। (জামিয়াতুল উলুমুল ইসলামিয়া, বানুরী টাউন ফতোয়া নং: ১৪৩৯০৯২০০২৪৩)
ইসলামে রোজা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত, যা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর মুসলমানদের ওপর বাধ্যতামূলক হয়। তবে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ইবাদতের প্রতি আগ্রহী ও অভ্যস্ত করে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই মা–বাবার উচিত তাদের শারীরিক সামর্থ্য ও বয়স বিবেচনা করে ধীরে ধীরে রোজার অনুশীলনে অভ্যস্ত করা। এতে করে তারা বড় হওয়ার পর সহজেই রোজাসহ অন্যান্য ইবাদত যথাযথভাবে পালন করতে পারবে এবং দ্বীনের পথে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।


