নির্বাচনী মাঠে প্রাধান্য পাচ্ছে তারেক প্ল্যান

নির্বাচনী মাঠে প্রাধান্য পাচ্ছে তারেক প্ল্যান 

অবসান হয়েছে সকল জল্পনা-কল্পনার। কেটেছে নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট আঁধার। গোটা দেশই এখন নির্বাচনমুখী। ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। পেয়েছেন ঐতিহাসিক রাজসিক সংবর্ধনা। গত তিনদিনে তাঁর ছুটে চলায় নতুন আবহে দেশ। ১৭ বছরের আওয়ামী দুঃশাসন ও গণহত্যার রক্তভেজা জমিনে পা রেখেই তিনি বলেছেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান (আমার একটি পরিকল্পনা আছে)’ ও ‘উই হ্যাভ আ প্ল্যান (আমাদের একটি পরিকল্পনা আছে)’। এই বাক্য দুটি এখন রাজনীতি, কূটনীতি থেকে চায়ের আড্ডাতেও উড়ে বেড়াচ্ছে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে তারেক রহমানের পরিকল্পনা নির্বাচনী হাওয়ায় গরম আমেজ তৈরি করেছে।
সবারই এখন জানতে চাওয়া আসলেই কী আছে নির্বাসন থেকে ফিরে আসা নেতার বানীতে। সাধারণ জনগণও সুক্ষভাবে বিষয়গুলো স্পষ্ট হতে চাচ্ছেন, আবার বিএনপির দলীয় নেতারা জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তারেক রহমানের সকল ভাবনা দেশ এবং জনগণকে নিয়েই। তবে বিএনপির দলীয় সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্র সংস্কারে ৩১ দফা, জিয়াউর রহমান ঘোষিত ‘১৯ দফা’, খালেদা জিয়া ঘোষিত ‘ভিশন ২০৩০’ এবং তারেক রহমান ঘোষিত ‘২৭ দফা’র মধ্যেই রয়েছে তারেক রহমানের সকল পরিকল্পনা। ১৯৭১, ৫২ এবং চব্বিশের চেতনায় তারুণ্যকে অগ্রাধিক দিয়েই ভাবনার রোডম্যাপ রয়েছে।
এদিকে আর মাত্র ৪৫ দিন পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ২৯ ডিসেম্বর সোমবার প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। গতকাল তিনি ভোটার হওয়ার সকল কাজ শেষ করেছেন। একই সঙ্গে তাঁর মেয়েও ভোটার হওয়ার কাজ শেষ করেছেন। একই সঙ্গে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা ইতোমধ্যে তাদের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। বড় দলগুলো প্রার্থী তালিকা এগিয়ে রেখেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারও নির্বাচন কমিশন তাদের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সব মিলিয়ে দেশ এখন পুরোপুরি নির্বাচনমুখী। আর নির্বাচনের স্রোতে ভাসছে তারেক রহমানের পরিকল্পনা।
দলীয় নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বলছেন, রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকায় আয়োজিত বিশাল গণসংবর্ধনায়  তারেক রহমান বিশ্বখ্যাত নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের ঐতিহাসিক উক্তি ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’-এর প্রসঙ্গ টেনে ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ শব্দ ব্যবহার করেন। তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন নতুন মাত্রা যোগ করেছে, তেমনি জনমনে সৃষ্টি করেছে কৌতূহল। অনেকে বলছেন, আসলে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনায় তার দৃষ্টিভঙ্গি। ‘ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবেও তাঁকে অনেকে দেখছেন। তবে দলীয় ভাষ্য, তারেক রহমানের পরিকল্পনা দলীয় নেতাকর্মীরা যেমন উজ্জীবিত এবং তাদের জনগণের কাছে যাওয়ার জন্য, তারেক রহমানের কাজ নিয়ে যাওয়ার জন্যই বিশেষ কাজ বা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তারেক রহমানের পরিকল্পনায় একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার রূপরেখা আছে, এতে কোনো সংশয় নেই। কেননা, বিএনপি এরই মধ্যে তাদের নীতি ও কর্মপরিকল্পনা নতুনভাবে সাজিয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি এমন একটি নীতিনির্ভর ও জ্ঞানভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেছে, যা আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করতে পারলে তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। তাই বিএনপি প্রস্তুত করেছে, আটটি বিশেষ খাতভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা। এগুলো হলোÑ ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, কর্মসংস্থান তৈরি, বেকার যুবকদের জন্য ভাতা, শিক্ষা, ক্রীড়া ও পরিবেশ এবং ধর্মীয় নেতাদের উন্নয়ন সেবা যার প্রতিটিই মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। ২০২৩ সালেল ১৩ জুলাই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা রূপরেখা জাতির সামনে উপস্থাপন করেছিলেন।
সেখানে বিশেষ ৮টি খাতের সঙ্গে রাষ্ট্র কাঠামো মেরামত, গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতার নিশ্চয়তা, দুর্নীতির ক্ষেত্রে কোনো আপোস না করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ‘অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন’, ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার নীতি, বৈদেশিক সম্পর্কে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, যুবসমাজের ভিশন, চিন্তা গবেষণাকে মর্যাদা এবং স্বীকৃতি, যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন, ‘জনকল্যাণমূলক জাতীয় ঐকমত্যের সরকার।’ রাষ্ট্র রূপান্তরমূলক সংস্কারে ‘জাতীয় সরকার’ ইত্যাদি রয়েছে।
এ বিষয়ে বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতার কাছে মন্তব্য চাইলে তাঁরা জানান, সুনির্দিষ্ট বিষয়ে পরিকল্পনাগুলো তারেক রহমানের মাধ্যমেই আসবে। বাকি বিষয়গুলো বিএনপির রাষ্ট্র সংস্কারের মধ্যেই রয়েছে।
জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, তারেক রহমানের একটা বিশেষ পরিকল্পনা আছে বলে জানিয়েছেন। এখন মানুষের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তাঁর সামনে একটা চ্যালেঞ্জ তৈরি হলো। তিনি একটা দলের প্রধান থেকে জাতীয় নেতা হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই রূপান্তরটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ এখন প্রতি মুহূর্তে তাঁর সকল কথার দিকে কাজের দিকে নজর রাখবে। কথা এবং কাজ দুটোই করে দেখাতে হবে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, তারেক রহমানের পরিকল্পনা দল এবং জনগণের মধ্যে বিশেষ বার্তা রয়েছে। তবে এখন সবচেয়ে গুরুপূর্ণ  সব রাজনৈতিক দল যেভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে তাতে এক কথায় বলা যায় যে, দেশ এখন নির্বাচনমুখী। দেশ যাতে নির্বাচনমুখী থাকে সে জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সমান সুযোগ রাখতে হবে। এ জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে উদ্যোগ নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে। পরিবেশ নিশ্চিত হলেই কেবল একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। সে নির্বাচনে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ নিশ্চিন্তে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। জনগণ বিগত তিনটি নির্বাচনে তাদের মতামত প্রয়োগ করতে পারেনি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আবেগপ্রবণ। তারা যেমন  দ্রুত আবেগ প্রকাশ করে, আবার আবেগ চলেও যায়। তাই তারেক রহমানকে এখন কাজ করে দেখাতে হবে। এবার তরুণরা নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হবে। ফলে তারা অতীতমুখী নয়, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা এবং সেটা বাস্তবায়নের সক্ষমতা দেখতে চায়। সেটা করতে না পারলে সাধারণ মানুষের আবেগ বেশি দিন থাকবে না।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *