জেন–জিদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে শিক্ষাপ্রযুক্তি বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কি

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি প্রজন্ম আগের প্রজন্মের তুলনায় বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়ছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে সাম্প্রতিক গবেষণায়। গবেষকদের মতে, জেনারেশন জেড বা জেন–জি এর ক্ষেত্রে বুদ্ধিমত্তা সূচকের (আইকিউ) যে পতন লক্ষ করা যাচ্ছে বা সূচকের মাত্রা কমে এসেছে।

ডিজিটাল প্যারাডক্স

নিউরোসায়েন্টিস্টদের একটি অংশের মতে, এই উদ্বেগজনক প্রবণতার জন্য দায়ী আধুনিক শিক্ষাপ্রযুক্তি। যে প্রযুক্তি শিক্ষাকে সহজ ও উন্নত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেটিই নাকি এখন তরুণদের চিন্তাশক্তি এবং দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা দুর্বল করে দিচ্ছে।

‘ফ্লিন ইফেক্ট’-এর উল্টো যাত্রা

দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বজুড়ে মানুষের গড় আইকিউ স্কোর ক্রমাগত বেড়েছে—এটিই ‘ফ্লিন ইফেক্ট’ নামে পরিচিত। তবে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, জেনারেশন জেডের ক্ষেত্রে এই ধারা ভেঙে পড়ছে। পড়া বোঝার ক্ষমতা, গাণিতিক বিশ্লেষণ, এমনকি স্থানিক বুদ্ধিমত্তার মতো ক্ষেত্রেও মান হ্রাস পাচ্ছে। গবেষকেরা বলছেন, এই পতন কোনো নির্দিষ্ট দেশ, শ্রেণি বা অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—বরং এটি একটি বৈশ্বিক ও কাঠামোগত সমস্যা।

তথ্যের অবাধ প্রবাহ আশীর্বাদ না অভিশাপ

ডিজিটাল যুগে শিক্ষার্থীদের হাতে স্মার্টফোন, ট্যাব ও ল্যাপটপ থাকায় যেকোনো তথ্য মুহূর্তেই পাওয়া যায়। নিউরোসায়েন্টিস্ট অ্যারন রোরক বলেন, ‘এই সহজলভ্যতা তরুণদের মস্তিষ্ককে “চিন্তা করার কাজ” থেকে অব্যাহতি দিচ্ছে। তারা মনে রাখার বা গভীরভাবে বোঝার বদলে দ্রুত উত্তর পাওয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।’ একে গবেষকেরা বলছেন ‘কগনিটিভ অফলোডিং’, অর্থাৎ মস্তিষ্কের কাজ প্রযুক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া। এর ফলে গভীর চিন্তা, স্মৃতির সঙ্গে তথ্যের সংযোগ ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা গড়ে ওঠার সুযোগ কমে যাচ্ছে।

এডটেকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

আজকের শিক্ষাপ্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোতে গেমিফিকেশন, তাৎক্ষণিক ফিডব্যাক ও ছোট ছোট লার্নিং মডিউলের ব্যবহার বাড়ছে। অনেক প্ল্যাটফর্ম শিক্ষার্থীর সক্ষমতা অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে কনটেন্ট সহজ করে দেয়। এগুলো শিক্ষার্থীদের যুক্ত রাখলেও দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ ধরে রেখে জটিল সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা দুর্বল করছে।

ডিজিটাল পরিবেশে বদলে যাচ্ছে মস্তিষ্ক

নিউরোসায়েন্স গবেষণা বলছে, মানুষের মস্তিষ্ক পরিবেশ অনুযায়ী নিজেকে গড়ে তোলে। কিন্তু ক্রমাগত নোটিফিকেশন, মাল্টিটাস্কিং ও স্ক্রিন–নির্ভরতা মস্তিষ্ককে এমনভাবে প্রশিক্ষিত করছে, যেখানে দ্রুত তথ্য স্ক্যান করা সম্ভব হলেও গভীর বিশ্লেষণ কঠিন হয়ে উঠছে।

সামাজিক ও শারীরিক প্রভাব

শুধু শিক্ষাপ্রযুক্তি নয়—অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের কারণে কমে যাচ্ছে মুখোমুখি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, খেলাধুলা ও শারীরিক সক্রিয়তা। এগুলো শিশু ও কিশোরদের নির্বাহী ক্ষমতা, স্থানিক বোধ ও সামাজিক বুদ্ধিমত্তা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিতর্ক ও ভিন্নমত

তবে সব গবেষক একমত নন। কেউ কেউ মনে করেন, জেনারেশন জেডের বুদ্ধিমত্তা কমেনি—বরং তা রূপান্তরিত হয়েছে। ডিজিটাল নেভিগেশন, দ্রুত তথ্য বাছাই বা অনলাইন সহযোগিতার মতো দক্ষতা প্রচলিত আইকিউ পরীক্ষায় ধরা পড়ে না। এ ছাড়া মানসিক স্বাস্থ্য, ঘুমের অভাব, কোভিড-১৯–এর প্রভাব ও সামাজিক পরিবর্তনকেও বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন অনেক গবেষক।

সমাধান কী

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাধান প্রযুক্তি বর্জন নয়—বরং সচেতন ও সীমিত ব্যবহার। প্রযুক্তিকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে, বিকল্প হিসেবে নয়। গভীর পাঠ, হাতে লেখা, স্মৃতিচর্চা, খেলাধুলা ও চ্যালেঞ্জভিত্তিক শেখাকে আবার গুরুত্ব দিতে হবে। নিউরোসায়েন্টিস্টরা বলছেন, মস্তিষ্কের নমনীয়তার কারণে এখনো পরিস্থিতি পাল্টানো সম্ভব। তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাস্থ্য রক্ষায় এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। তথ্যসূত্র: ওয়েব প্রো নিউজ

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *