রমজানে শিশুর প্যারেন্টিং সচেতনতা

রমজান শুধু ইবাদতের মাস নয়; এটি আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণের উত্তম সময়। এই মাসে পরিবারের পরিবেশও পরিবর্তিত হয়—সাহরি, ইফতার, তারাবি, কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদির মাধ্যমে ঘরে একটি আলোকিত আবহ তৈরি হয়। শিশুরা স্বভাবতই তাদের আশপাশের পরিবেশ থেকে শিক্ষা নেয়।

তাই রমজান হতে পারে শিশুর প্যারেন্টিং সচেতনতার ও চেতনা গড়ে তোলার সেরা সময়। ইসলামের দৃষ্টিতে যেমন সন্তানের সঠিক লালন-পালন একটি আমানত, তেমনি আধুনিক মনোবিজ্ঞানও বলে—শিশুর চরিত্র গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো পারিবারিক পরিবেশের মধ্যে তার বেড়ে ওঠা।

রমজানে শিশুর প্যারেন্টিং সচেতনতার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে তুলে ধরা হলো—

১.⁠ ⁠ধর্মীয় আবহে চলার অভ্যাস গড়ে তোলা: শিশুদের জন্য রমজানকে আনন্দময় ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করা জরুরি। পরিবারে কুরআন তিলাওয়াত, নামাজ, দোয়া ও ইফতারের সময় একত্রে বসা—এসব শিশুদের মনে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা করো (সূরা তাহরিম, ৬)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও। (আবু দাউদ) অর্থাৎ ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় অনুশীলনের পরিবেশ তৈরি করা অভিভাবকদের দায়িত্ব।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিশুরা মডেলিং পদ্ধতিতে শেখে—অর্থাৎ তারা যা দেখে তাই অনুকরণ করে। তাই বাবা-মা যদি নিজেরাই ইবাদতে আন্তরিক হন, শিশুরাও স্বাভাবিকভাবে সেই অভ্যাস গড়ে তোলে।

২.⁠ ⁠শিশুদের রোজা রাখার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা: রমজান শিশুদের কাছে খুবই আকর্ষণীয় একটি সময়। যদিও ছোট শিশুদের উপর রোজা ফরজ নয়, তবুও তাদের ধীরে ধীরে রোজার সাথে পরিচিত করানো গুরুত্বপূর্ণ। অনেক পরিবারে শিশুদের অর্ধদিবস রোজা বা কয়েক ঘণ্টা রোজা রাখতে উৎসাহ দেওয়া হয়। এতে তাদের মধ্যে ইবাদতের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর যুগে সাহাবিরা তাদের শিশুদেরও রোজার অনুশীলনে উৎসাহ দিতেন। সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে, শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখতে সাহাবিরা তাদের জন্য খেলনা বানিয়ে দিতেন যাতে তারা রোজার সময় ধৈর্য ধরে থাকতে পারে (বুখারি)।

প্যারেন্টিং বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিশুদের কোনো ভালো অভ্যাস শেখাতে হলে সেটিকে আনন্দময় অভিজ্ঞতায় পরিণত করতে হয়। তাই শিশু রোজা রাখলে তাকে প্রশংসা করা, ইফতারে তার পছন্দের খাবার রাখা কিংবা ছোট উপহার দেওয়া—এসব তাকে উৎসাহিত করে।

৩.⁠ ⁠দান-সদকা ও সহমর্মিতার চর্চা: রমজান আমাদেরকে দরিদ্র ও অভাবীদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দানের মাত্রা প্রবহিত বাতাসের মতো বেড়ে যেত।

এই শিক্ষাটি শিশুদের মনে গভীরভাবে গেঁথে দেওয়া উচিত। তাদের দিয়ে ছোট ছোট দান করানো, ইফতার বিতরণে অংশ নিতে দেওয়া বা গরিবদের জন্য খাবার প্রস্তুত করতে সাহায্য করানো—এসব তাদের হৃদয়ে সহমর্মিতা সৃষ্টি করে।

প্যারেন্টিং বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোটবেলা থেকেই সহানুভূতির শিক্ষা দিলে শিশুরা বড় হয়ে দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হয়ে ওঠে। রমজান সেই মানবিকতা শেখানোর জন্য একটি আদর্শ সময়।

৪.⁠ ⁠ডিভাইস ও স্ক্রিন আসক্তি থেকে দূরে রাখা: বর্তমান যুগে শিশুদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মোবাইল, ট্যাব ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত আসক্তি কমানো বা নিয়ন্ত্রণ করা। রমজান হতে পারে এই অভ্যাস কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।রমজানে পরিবারের সবাই যদি ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত, ইসলামি গল্প বা পারিবারিক আলোচনায় সময় দেয়, তাহলে শিশুদের মনোযোগ স্বাভাবিকভাবেই স্ক্রিন থেকে সরে আসে।

মনোবিজ্ঞান ও শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের মনোযোগ কমিয়ে দেয়, ঘুমের সমস্যা তৈরি করে এবং আচরণগত সমস্যাও বাড়াতে পারে। তাই রমজানে একটি ডিজিটাল রুটিন তৈরি করা যেতে পারে—যেখানে নির্দিষ্ট সময় ছাড়া ডিভাইস ব্যবহার সীমিত থাকবে এবং তার পরিবর্তে বই পড়া, গল্প শোনা বা পারিবারিক ইবাদতে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

৫.⁠ ⁠ভালো চরিত্র ও আখলাক গড়ে তোলা: রমজানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো চরিত্র সংশোধন। শিশুদের শেখাতে হবে যে রোজা শুধু ক্ষুধা-পিপাসা থেকে বিরত থাকার নাম নয়; এটি মিথ্যা, ঝগড়া, গালি ও খারাপ আচরণ থেকেও বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কাজ ত্যাগ করল না, তার খাদ্য-পানীয় ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই (বুখারি)।

প্যারেন্টিং বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর চরিত্র গঠনের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো ইতিবাচক প্রশংসা ও ধারাবাহিক শিক্ষা। যখন শিশু ভালো আচরণ করবে, তখন তাকে প্রশংসা করা উচিত। এতে তার মধ্যে সেই আচরণ স্থায়ী হয়ে যায়।

রমজান শিশুদের জন্য শুধু একটি ধর্মীয় মাস নয়; এটি তাদের চরিত্র, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মানবিকতা গড়ে তোলার এক অনন্য সুযোগ। যদি অভিভাবকরা সচেতনভাবে এই মাসের পরিবেশকে কাজে লাগান—ধর্মীয় শিক্ষা, সহমর্মিতা, রোজার প্রতি আগ্রহ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের ভারসাম্য শেখান—তাহলে শিশুরা শুধু ভালো মুসলিমই নয়, ভালো মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠবে।

সুতরাং রমজানকে কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মাস হিসেবে নয়, বরং একটি পারিবারিক চরিত্র গঠনের বিদ্যালয় হিসেবে গ্রহণ করাই হবে সচেতন প্যারেন্টিংয়ের প্রকৃত লক্ষ্য।

লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *