ক্রিয়েটিন কি ঘুমের মান উন্নত করতে পারে? নতুন গবেষণা যা বলছে

ক্রিয়েটিন গ্রহণের সময় অংশগ্রহণকারীরা ঘুমের মান ভালো মনে করেছেন

ক্রিয়েটিন নিয়ে আগ্রহ এখন তুঙ্গে। বহু বছর ধরে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বা ফিটনেস লেভেল যা–ই হোক, এই সাপ্লিমেন্ট শক্তি ও পেশি গঠনে সহায়ক। এখানেই শেষ নয়। এখন গবেষকেরা খুঁজে দেখছেন, কোষের শক্তি উৎপাদনে, বিশেষ করে মস্তিষ্কে, ক্রিয়েটিনের ভূমিকা কী। আর সেটি কীভাবে স্মৃতিশক্তি, আরোগ্য ও ঘুমে প্রভাব ফেলতে পারে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি র‍্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল্ড ট্রায়াল বা নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষামূলক গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, ক্রিয়েটিন সাপ্লিমেন্ট হয়তো ঘুমের ব্যক্তিগত অনুভূত মান (সাবজেক্টিভ স্লিপ কোয়ালিটি), মানসিক পারফরম্যান্স ও উচ্চমাত্রার ব্যায়ামের ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। চলুন সহজ করে বিষয়টি বুঝে নেওয়া যাক।

গবেষণাটি কীভাবে করা হয়েছিল?

এই গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল, অল্প সময়ের একটি ‘লোডিং ফেজ’ ক্রিয়েটিন গ্রহণ করলে শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক কার্যক্ষমতা, মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, আরোগ্য ও ঘুমে কোনো পরিবর্তন আসে কি না।

লোডিং ডোজ বলতে বোঝায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় (প্রতিদিন প্রায় ২০ গ্রাম) কয়েক দিন ক্রিয়েটিন গ্রহণ, যাতে শরীরে দ্রুত এর মাত্রা বেড়ে যায়। সাধারণত প্রতিদিন ৫ গ্রাম ডোজই প্রচলিত।

এ গবেষণায় ১৪ জন শারীরিকভাবে সক্রিয় পুরুষ অংশ নেন। তাঁরা এক সপ্তাহে প্রতিদিন ২০ গ্রাম ক্রিয়েটিন মনোহাইড্রেট অথবা প্লাসিবো গ্রহণ করেন। এটি ছিল ডাবল-ব্লাইন্ড ও ক্রসওভার ডিজাইন—অর্থাৎ অংশগ্রহণকারীরা জানতেন না, কখন তাঁরা আসল সাপ্লিমেন্ট নিচ্ছেন আর কখন প্লাসিবো।

ঘুম পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হয় কবজিতে পরা অ্যাক্টিভিটি মনিটর। পাশাপাশি ঘুমের মান ও সার্বিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্নপত্র পূরণ করেন অংশগ্রহণকারীরা

কী পাওয়া গেল?

গবেষণার ফল বলছে—

 

  • ক্রিয়েটিন গ্রহণের সময় অংশগ্রহণকারীরা ঘুমের মান ভালো মনে করেছেন
  • তাঁরা তুলনামূলকভাবে আগে বিছানায় গেছেন
  • মানসিক পারফরম্যান্স ও উচ্চমাত্রার ব্যায়ামের সক্ষমতা বেড়েছে
  • পেশির ব্যথা কম অনুভূত হয়েছে

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অবজেক্টিভ মাপে (মোট ঘুমের সময়, স্লিপ এফিশিয়েন্সি, ঘুমাতে কত সময় লাগে) তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি। অর্থাৎ তাঁরা বেশি সময় ঘুমাননি, কিন্তু ঘুম থেকে উঠে নিজেদের বেশি সতেজ মনে করেছেন। এটাও কম কথা নয়।

গবেষকেরা মনে করছেন, ক্রিয়েটিন হয়তো শরীর ও মস্তিষ্কের শক্তি-নির্ভর প্রক্রিয়াগুলোকে সহায়তা করে। ফলে ঘুমের দৈর্ঘ্য না বদলালেও বিশ্রামের অনুভূতি বাড়তে পারে।

নারীদের ক্ষেত্রে কী হবে?

ঘুমের ঘাটতির পরিস্থিতিতে নারীদের জ্ঞানীয় সক্ষমতায় ক্রিয়েটিন উপকার করতে পারে, তবে আরও গবেষণা দরকার

এই গবেষণার একটি বড় সীমাবদ্ধতা, এতে শুধু পুরুষ অংশ নিয়েছেন। অথচ নারীদের ঘুমে হরমোনজনিত ওঠানামার (মাসিক চক্র, পেরিমেনোপজ, মেনোপজ) বড় প্রভাব থাকে। সার্কাডিয়ান রিদম, শরীরের তাপমাত্রা, মানসিক চাপ—সবকিছুই এতে বদলে যেতে পারে।

আগের কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের ঘাটতির পরিস্থিতিতে নারীদের জ্ঞানীয় সক্ষমতায় ক্রিয়েটিন উপকার করতে পারে। তবে নারীদের ঘুমের মান, আরোগ্য ও মস্তিষ্কের শক্তি ব্যবস্থায় এর প্রভাব নিয়ে আরও নির্দিষ্ট গবেষণা দরকার।

আগের গবেষণার সঙ্গে মিল কোথায়?

২০২৪ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, খুব কম (প্রায় তিন ঘণ্টা) ঘুমের পর উচ্চমাত্রার একবারের ক্রিয়েটিন ডোজ দিলে মস্তিষ্কের শক্তি বিপাকক্রিয়া দ্রুত উন্নত হয়। তিন ঘণ্টার মধ্যেই উপকার দেখা যায়, চার ঘণ্টার দিকে তা সর্বোচ্চে পৌঁছায় এবং প্রায় নয় ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

বিশেষ করে প্রসেসিং ক্ষমতা ও স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিতে উন্নতি লক্ষ করা যায়, যে ক্ষেত্রগুলো ঘুমের অভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দুটি গবেষণার মিলিত বার্তা

ক্রিয়েটিন হয়তো সরাসরি ঘুমের সময় বাড়ায় না, কিন্তু শক্তির ঘাটতির চাপ থেকে মস্তিষ্ককে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে। সে চাপ তীব্র ব্যায়াম থেকেই আসুক বা ঘুমের অভাব থেকে।

ভালো ঘুমের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার ও নিয়মিত ব্যায়ামের বিকল্প নেই

ক্রিয়েটিন নেওয়ার নিয়ম

গবেষণা বলছে, প্রতিদিন ৫ গ্রাম ক্রিয়েটিন মনোহাইড্রেট পেশিতে পর্যাপ্ত মাত্রা বজায় রাখতে যথেষ্ট। দীর্ঘমেয়াদে পেশির স্বাস্থ্য ও শক্তির জন্য এটাই প্রচলিত ডোজ।

অল্প সময়ের জন্য (১০–২০ গ্রাম প্রতিদিন) বেশি মাত্রা নেওয়া হয় সাধারণত লোডিং ফেজে বা বিশেষ পরিস্থিতিতে, যেমন উচ্চ মানসিক চাপ বা ঘুমের ঘাটতি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়মিত গ্রহণ। মাঝেমধ্যে খেলে তেমন উপকার পাওয়া যায় না।

শেষ কথা

ছোট পরিসরের এই গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, ক্রিয়েটিন হয়তো আপনাকে বেশি সতেজ অনুভব করতে, মনোযোগ ধরে রাখতে এবং তীব্র ব্যায়ামে ভালো পারফর্ম করতে সহায়তা করতে পারে।

তবে এটি কোনো ‘ম্যাজিক পিল’ নয়। পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার ও নিয়মিত ব্যায়ামের বিকল্প নেই। ক্রিয়েটিনকে দেখা যেতে পারে একটি সহায়ক উপাদান হিসেবে, বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করেন বা মানসিকভাবে উচ্চচাপের মধ্যে থাকেন।

আপনি যদি সাপ্লিমেন্ট শুরু করার কথা ভাবেন, আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে কথা বলা ভালো। নিজের শরীরের কথা শোনা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

সূত্র: মাইন্ডবডিগ্রিন

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *