সরকারি দামে মিলছে না সার, বোরো চাষে বাড়ছে খরচ

বোরো খেতের পাশে সারের দামসহ নিজেদের নানা দুর্দশার কথা বলছেন কৃষকেরা। গতকাল রোববার দুপুরে বরিশাল সদরের কাশীপুরের করমজা এলাকায়

বরিশালে বোরো মৌসুমে সরকার নির্ধারিত দামে সার পাচ্ছেন না কৃষকেরা। এতে বোরো আবাদে ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। সঙ্গে সেচ, কীটনাশক ও সেচের খরচ মিটিয়ে লাভের সম্ভাবনা দেখছেন না কৃষকেরা। ফলে অনেকে বোরো আবাদের পরিধি কমিয়েছেন। রোববার বরিশালের বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

বরিশালের উজিরপুরের জল্লা ইউনিয়নের চিনিবাড়ী গ্রামের কৃষক মো. সেলিম এবার ২৫ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। নিজ এলাকায় বোরো আবাদের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, খুব একটা লাভ না হওয়ায় এলাকার অনেকেই বোরো আবাদের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। আবার অনেকে চাষ করছেনই না। সেচ, সার, ওষুধের যে ব্যয়, তা দিয়ে এখন পুষিয়ে থাকা দুষ্কর।

কৃষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বোরো মৌসুমে জমিতে প্রচুর ইউরিয়া ও ডিএপি (ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট) সারের প্রয়োজন হয়। কৃষকদের এসব সার সংগ্রহ করতে হয় সারের ডিলার, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে। বেশি জমি আবাদ করেন এমন কয়েকজন কৃষক জানান, ডিলারদের কাছ তাঁরা প্রতি ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া সার ক্রয় করছেন ১ হাজার ৪৫০ টাকায়। আর একই ওজনের প্রতি বস্তা ডিএপি সার ক্রয় করতে হয় ১ হাজার ২৫০ টাকায়। এতে প্রতি কেজি সারের দাম পড়ে ২৯ টাকা। প্রতি কেজি ডিএপি সারের দাম পড়ে ২৫ টাকা; কিন্তু সরকার ইউরিয়ার সারের প্রতি কেজির মূল্য নির্ধারণ করেছে ২৭ টাকা এবং ডিএপি সারের মূল্য প্রতি কেজি ২১ টাকা। সাবডিলার অথবা স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কিনলে সারের দাম পড়ে আরও বেশি।

বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ও উজিরপুরের ধামুরা এলাকায় প্রায় ২৫ একর জমিতে এবার বোরো আবাদ করছেন কৃষক সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রতি বস্তা ইউরিয়া তাঁরা ১ হাজার ৪৬০ টাকায় ক্রয় করেন। আর ডিএপির দাম পড়ে ১ হাজার ২৫০ টাকা। সার, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি দিয়ে এখন আর বোরো আবাদ করে খুব একটা লাভের মুখ দেখা যায় না। তবু দীর্ঘদিন কৃষিকাজ করেন বলে এটা ছেড়ে দিতে পারছেন না।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ২ লাখ ৫ হাজার ৩৮৮ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। এরই মধ্যে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭৮ হেক্টর। বরিশাল জেলায় বোরো আবাদ হয়েছে ৬২ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে।

রোববার সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, আগৈলঝাড়া, উজিরপুর উপজেলার অনেক এলাকায় জমিগুলোতে বোরো ধানের চারা রোপণ শেষ হয়েছে। আবার বেশ কিছু এলাকায় চারা রোপণের কাজ চলছে। কৃষকেরা বোরো আবাদে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে সব খরচ মিটিয়ে লাভের মুখ দেখবেন কিনা, এ নিয়ে অনেকের কপালে চিন্তার ভাঁজ।

বরিশাল সদরের করমজা এলাকার কৃষক গিয়াস উদ্দিন এবার সাত একর জমিতে বোরো চাষ করেছেন। তিনি বলেন, বোরো চাষে এবার প্রতি একরে ৩০ হাজার টাকা খরচ হবে। কিন্তু ৩০ হাজার টাকার ধান উঠবে কি না, নিশ্চিত না।

গিয়াস উদ্দিনের অভিযোগ, পাম্প থেকে কৃষকদের কাছে ডিজেল বিক্রি করা হয় না। বাইরে থেকে বেশি দামে কিনতে হয়। ফলে বেশি দামে কিনতে হয়, অনেক সময় মাপেও কম দেওয়া হয়। তিনি জানান, দুজন সার ডিলারকে ফোন দিয়েছেন, তাঁরা জানিয়েছেন, সারের সরবরাহ নেই। বাইরে থেকে বেশি দামে সার কিনতে হয়। তিন-চার বছরে কীটনাশকের দাম দ্বিগুণ বেড়েছে। আগে যা ছিল ১০০ টাকা, এবার সেই ওষুধের দাম ২৫০ টাকা। সরকার বা কৃষি অফিস এসব নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

বোরো খেতের আগাছা পরিষ্কার করছেন এক কৃষক। রোববার দুপুরে বরিশাল সদরের কাশীপুরের করমজা এলাকায়

নিজের আবাদ করা বোরো খেতে আগাছা পরিষ্কার করছিলেন আবদুল বারেক নামের আরেক কৃষক। কাজের ফাঁকে তিনি জানান, বোরো চাষ কমিয়ে দিয়েছেন। নিজেদের খাওয়ার জন্য যতটুকু দরকার সেটুকু চাষ করেন। তিনি বলেন, এখন মজুরির দাম বেশি, খরচ বেশি, সারের দাম বেশি; কিন্তু ফলন তুলনামূলক কম। কৃষিতে আসলে লাভ নেই, দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করে আসছেন, তাই করেন। ১ হাজার ৫০ টাকার ডিএপি সার ১ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১ হাজার ২৫০ টাকার ইউরিয়া সার কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৪৫০ টাকায়।

তবে দেশে সারের কোনো সংকট নেই উল্লেখ করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বরিশাল অঞ্চলের যুগ্ম পরিচালক (সার ও বীজ) মো. আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের সারের কোনো সংকট নেই। বরং সার রাখার জায়গা নেই। সরকার প্রতি বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ২৫০ টাকা এবং ডিএসপি ১ হাজার ৫০ টাকা নির্ধারণ করেছে।’ অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এটা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ দেখভাল করে। তাই আমি এ বিষয়ে বলতে পারছি না।’

পরে এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের বরিশাল বিভাগীয় অতিরিক্ত পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম সিকদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। তবে সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে খোঁজ নেব। অভিযোগের সত্যতা পেলে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পড়াশোনার ফাঁকে বাবার কৃষিকাজে সহযোগিতা করে নবম শ্রেণির ছাত্র রাফি সরদার। রাফি সার কিনতে গিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলে, ‘বাবায় গতকাল (শনিবার) দেড় হাজার টাকা দিয়ে আমাকে সার কিনতে পাঠায়। এক বস্তা ইউরিয়া ও পাঁচ কেজি ডিএসপি সার কিনতে বলছিল। ডিলারের কাছে গিয়ে সার নেওয়ার পর বলে সারের বস্তা ১ হাজার ৪৫০ টাকা। পরে বাড়ি গিয়ে বাড়তি টাকা আনতে হয়েছে।’

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *