তোফাজ্জেলের কারখানায় উৎপাদন হয় মোটরসাইকেলের ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ

নিজের কারখানায় উৎপাদিত মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ দেখাচ্ছেন তোফাজ্জেল হোসেন। সম্প্রতি যশোর শহরের বারান্দি পাড়ায়।

যশোরের বাসিন্দা তোফাজ্জেল হোসেন (মানিক)। দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনায় প্রাথমিকের গণ্ডি পার হতে পারেননি। তবে নিজের পরিশ্রমে ভাগ্য বদলেছেন। সাত হাজার টাকায় শুরু করা উদ্যোগ থেকে তিনি এখন কোটি কোটি টাকার মালিক।

প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, ‘দারিদ্র্যের কষ্ট আমি বুঝি। আমার বাবা ছিলেন ছোট মুদিদোকানি। অভাবের সংসারে ছয় ভাইবোনের লেখাপড়ার খরচ বাবা চালাতে পারেননি। এ জন্য আমার চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়ার সুযোগ হয়েছে। এরপর নেমে পড়তে হয়েছে কাজে।’

তোফাজ্জেলের মা তাঁকে ওষুধ কেনার জন্য ৬০ টাকা দিয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়ে তিনি ওষুধ না কিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে গাড়ির পুরোনো লোহা ও যন্ত্রপাতি কিনেছিলেন। সেগুলো ঘষেমেজে বিক্রি করে কিছু টাকা লাভ হয়। এরপর তিনি ঢাকার ইসলামনগরে চলে যান। সেখানে প্লাস্টিক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে কিছু জিনিস বানানো শেখেন।

১৯৯৮ সালে যশোরে ফিরে সাত হাজার টাকা দিয়ে একটি যন্ত্র কেনেন তোফাজ্জেল। সেই যন্ত্র শোবার ঘরের খাটের পাশে বসিয়ে প্লাস্টিকের ছোট ছোট জিনিস বানানো শুরু করেন, যা কিনা মোটরসাইকেলে ব্যবহৃত হয়। এভাবেই তাঁর ব্যবসার শুরু।

উদ্যোক্তা তোফাজ্জেল হোসেনের এখন সিয়াম মোটরস নামের একটি বিক্রয়কেন্দ্র আছে। নিজের দুটি কারখানায় উৎপাদিত মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ এখানে বিক্রি হয়। সিস ও বিডি গোল্ড নামের দুটি ব্র্যান্ডের পণ্য আছে তাঁর। নিজের কারখানায় উৎপাদিত এই ব্র্যান্ডের পণ্য ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হয়। তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, ‘আমার তিন ছেলেমেয়ের নামের আদ্যক্ষর দিয়ে সিস (এসআইএস) ব্র্যান্ড তৈরি করেছি।’

ঢাকার বংশাল এলাকার রহিমা অটো প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী জাবেদ হোসেন বলেন, ‘আমি অনেক দিন ধরে তোফাজ্জেল হোসেনের সিয়াম মোটরস থেকে মোটরসাইকেলের সাইড স্ট্যান্ড, ডাবল স্ট্যান্ড ও পাদানি পাইকারি দামে কিনে নিয়ে আসি। তাঁর পণ্য দুটি ব্র্যান্ড সিস ও বিডি গোল্ড নামেই বাজারে বিক্রি হয়। দেশীয় উৎপাদন হিসেবে তাঁর পণ্যের গুণগত মান তুলনামূলক ভালো।’

বছরে দুই কোটি টাকার লেনদেন

মাত্র সাত হাজার টাকা দিয়ে যে ব্যবসা তোফাজ্জেল শুরু করেছিলেন, কয়েক বছরের ব্যবধানে সেটা অনেক বড় হয়। শোবার ঘরের ছোট যন্ত্র থেকে এখন তাঁর বড় দুটি কারখানা হয়েছে। কারখানায় উৎপাদিত মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ বিক্রির জন্য শহরের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সড়কে সিয়াম মোটরস নামে শোরুম করেছেন। এসব যন্ত্রাংশ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায়। কারখানা ও শোরুম মিলে কাজ করেন ২৬ কর্মী। সব মিলিয়ে তাঁর ব্যবসার বার্ষিক লেনদেন প্রায় দুই কোটি টাকা।

নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করছেন

তোফাজ্জেল হোসেন উদ্যোক্তা তৈরি করছেন। তাঁর ভাষ্য, তিনি ১৫ বছর ধরে দরিদ্র ও অসহায় তরুণদের প্রশিক্ষণ, উৎসাহ-উদ্দীপনা ও বিনা সুদে ঋণ দিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কাজ করছেন। এ পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনকে বিনা সুদে ঋণ দিয়েছেন। তাঁর দেওয়া ঋণের পরিমাণ থাকে ২ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা। অনেকে একবার পাওয়া ঋণ পরিশোধ করে আবারও নিয়ে ব্যবসায় খাটান। যাঁদের আর্থিক অবস্থা বেশি খারাপ, টাকা ফেরত দেওয়ার সামর্থ্য নেই, তাঁদের তিনি এককালীন অনুদান দেন।

তোফাজ্জেলের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়া একজন হলেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সোহেল রানা। তিনি বলেন, তিনি কৃষি উদ্যোক্তা হতে চান। এক বেলা লেখাপড়া করেন, অন্য বেলা সবজি বিক্রি করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে তাঁর খুচরা সবজি বিক্রির দোকান আছে। আরেকটি দোকান আছে। তাঁর বাড়ি মনিরামপুর উপজেলার পাড়দিয়া গ্রামের বাজারে।

আছে আরও উদাহরণ

ঋণ নিয়ে নিজের অবস্থার পরিবর্তন করা আরেকজন হলেন যশোর শহরের বেজপাড়া এলাকার জেসমিন খাতুন। তিনি একসময় ভিক্ষাবৃত্তিতে ছিলেন। একদিন তিনি তোফাজ্জেলের সিয়াম মোটরসের বিক্রয়কেন্দ্রে ভিক্ষা করতে যান। তোফাজ্জেল তাঁকে এই পেশা বাদ দেওয়ার পরামর্শ দেন। বিনা সুদে দুই হাজার টাকা ঋণ দিয়ে বাদাম বিক্রি শুরু করতে উৎসাহ দেন।

জেসমিন এখন যশোর রেলস্টেশন এলাকায় ফেরি করে বাদামভাজা বিক্রি করেন। কথা হলে তিনি বলেন, তোফাজ্জেল তাঁকে টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করে দিয়েছেন। এখন আর তাঁকে কারও কাছে হাত পাততে হয় না। প্রতিদিন যা আয় হয়, তাতে কোনোভাবে সংসার চলে যায়।

আরেকজন হলেন যশোর শহরের রেলগেট এলাকার রোমেসা বেগম। তিনি সিয়াম মোটরস কারখানায় শ্রমিকের কাজ করতেন। সারা দিন কারখানায় কাজ করে তিনি সংসারে স্বামী–সন্তানদের সময় দিতে পারতেন না। তিনি চটপটির দোকান দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তোফাজ্জেল হোসেন বিনা সুদে তাঁকে সাত হাজার টাকা ঋণ দেন। রোমেসা সেই টাকায় রেলগেট আবাসিক এলাকায় টেবিল বসিয়ে চটপটি বিক্রি শুরু করেন। রোমেসা বললেন, তাঁর ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেছে। ঋণের সেই টাকা পরিশোধও করে দিয়েছেন।

এসব সাফল্য তোফাজ্জেল হোসেনকে আনন্দ দেয়। তিনি আরও বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখেন। তিনি বলেন, ‘আমি স্বপ্ন দেখি, একটি কারিগরি ইনস্টিটিউট স্থাপন করার। সেখানে প্রশিক্ষণসহ বিনা সুদে ঋণ দিয়ে অনেক মানুষকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। কোনো মানুষ যেন কর্মবিমুখ না থাকে।’

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *