প্রোগ্রামিংয়ের সঙ্গে কবিতার মিল যেখানে

সালেহ উদ্দিন আহমদ তখন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব লুজিয়ানার পিএইচডির ছাত্র

বাংলাদেশি কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ সালেহ উদ্দিন আহমদ থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। দীর্ঘদিন কাজ করেছেন জেরক্স ও আইবিএমে, কম্পিউটারবিজ্ঞানে শিক্ষকতা করেছেন সৌদি আরবের কিং ফাহাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে। কীভাবে প্রোগ্রামিংয়ের সঙ্গে তাঁর সখ্য হলো, পড়ুন তাঁর বয়ানে।

একটা বয়সে কবিতা কে না লিখেছে? আমিও লিখতাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। আপনি হয়তো ভাবছেন, সি প্রোগ্রামিংয়ের সঙ্গে কবিতার কী সম্পর্ক? সে কথাই বলছি।

কম্পিউটারবিজ্ঞানে লেখাপড়ার সময় থেকেই আমাকে অনেকগুলো প্রোগ্রামিং ভাষা শিখতে হয়েছিল। কাজ করতে গিয়ে আরও অনেক নতুন প্রোগ্রামিং শিখতে হলো—জাভা, পাইথন, রুবি। কিন্তু একটা প্রোগ্রামিং ভাষা সব সময় মনে গেঁথে রয়েছে, সেটা হলো ‘সি’। আমার কাছে ‘সি’ হলো কম্পিউটারের মাতৃভাষা। অন্য ভাষাগুলো অনেকটা ‘ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ’-এর মতো, দরকার হলে ব্যবহার করি।

যেকোনো কাজে ছন্দ লাগে। ছন্দ কেটে গেলে কাজটা ভন্ডুল হয়ে যায়। প্রোগ্রামিং ব্যাপারটাও তাই। আবার সব প্রোগ্রামিং ভাষায় ছন্দ অত ভালো হবে না, যেমন হয় সি-তে। সি-তে প্রোগ্রাম লিখতে গেলে আমি কবিতার মতো ছন্দ খুঁজে পেতাম। যেন অবোধ্য শব্দে, ক্রিপটিক শব্দবিন্যাসে, ইনডেন্টেশন দিয়ে আঁকাবাঁকা বাক্যে লেখা! অন্য প্রোগ্রামিং ভাষায় যে কাজ করতে ১ হাজার শব্দ লাগে, সি ভাষায় সেটা ৫০০ শব্দে দক্ষভাবে করে ফেলা যায়। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। অন্য সব প্রোগ্রামিংয়ে এ-এর মানকে ১ যোগ করে বাড়াতে হয়তো এভাবে লেখা হবে—

এ = এ+১

সি-তে আমি লিখব—

এ++

শুধু সৌন্দর্য ও ছন্দ নয়। সি-এর প্রতি আমার দুর্বলতার আরও বড় বড় কারণ আছে। কম্পিউটার–কর্মজীবনের প্রাতঃকালে সি আমাকে অনেকভাবে সাহায্য করেছে—কখনো চাকরি পেতে, কখনো চাকরি বজায় রাখতে, আবার কখনো একটা ভালো কাজ করে সহকর্মীদের তাক লাগিয়ে দিতে।

অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে প্রোগ্রামিং ছেড়ে আরও বড় দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। কিন্তু সি-কে আমি কখনো ছাড়িনি, সি-ও কখনো আমাকে ছাড়েনি।

কর্মজীবনের মধ্য পথে হঠাৎ খেয়াল হলো নামের আগে একটা ‘ডক্টর’ লাগালে ভালো দেখাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হয়ে গেলাম। দীর্ঘ সময় লাগবে, বুঝলাম খুব কঠিন সময় যাবে। সবচেয়ে বড় সংকট টাকার। আগে বুঝিনি, বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া অল্প কিছু টাকা সংসার চালাতে পর্যাপ্ত হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের যত জাঁদরেল অধ্যাপক আছেন, ধরনা দিলাম তাঁদের কাছে—যদি কারও প্রকল্পে কাজ পাওয়া যায়। আশ্বাস পেলাম, কিন্তু কাজ পেলাম না। হঠাৎ একদিন একটা ই–মেইল পেলাম আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামের প্রধান ড. জ্যাকসনের থেকে। সি প্রোগ্রামিং কোর্স পড়াতে তাঁর একজন ইনস্ট্রাক্টর দরকার, জিজ্ঞেস করলেন, আমি পারব কি না।

লুফে নিলাম। একে তো ‘সি’, তার ওপর ৮০০ ডলার বেতন, সপ্তাহে দুই দিন ক্লাস। ভালোই চলছিল।

একদিন পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন দেখলাম—জিপিএস নিয়ে কাজ করতে নিউ অরলিন্সের নেভিগেশন ডেটা সিস্টেমস নামে একটা কোম্পানিতে একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলী দরকার। তখন আমার গ্রিন কার্ড ছিল না। ভাবলাম দেখা যাক, চাকরিটা পেলে ওদের মারফত গ্রিন কার্ডটা যদি করানো যায়। জিপিএসের কিছুই আমি জানতাম না, তাই খুব আশা না করেই দরখাস্ত দিলাম।

ইন্টারভিউতে ড. এডমুন্ড ক্রিস্টির সঙ্গে পরিচয় হলো, কোম্পানির তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং টেকনিক্যাল ডিরেক্টর। তিনি কোনো টেকনিক্যাল প্রশ্ন করলেন না। কাজটা বুঝিয়ে বললেন, তাঁদের ছোট কোম্পানি, একজনকেই সব ‘ইন্টারফেস’ লিখতে হবে। আরও বললেন, ‘বেশ জটিল একটা প্রজেক্ট। তুমি যেহেতু কম্পিউটারে এত লেখাপড়া করেছ, তোমার কাজটা পারা উচিত।’

বললাম, ‘অবশ্যই পারব স্যার।’

আর কী–ই বা বলা যেত? ইন্টারভিউ শেষ হওয়ার আগে, ক্রিস্টি একটা শর্ত দিলেন। ‘দেখো, কোম্পানিতে ফোরট্রান ল্যাঙ্গুয়েজ ছাড়া অন্য কোনো ভাষা অ্যালাও করব না। অনেকে কাজটা সি-তে করতে চেয়েছিল, আমি রাজি হইনি। সি-তে ওই সব পয়েন্টার—শুনেছি খুব ঝামেলার। তুমি যদি ফোরট্রানে কাজ করতে রাজি থাকো, তাহলে তোমাকে বিবেচনা করব।’

বললাম, ‘অবশ্যই স্যার।’

মন একটু খারাপ হলো। সি ব্যবহার করতে পারব না! নিজেকে প্রবোধ দিলাম—‘মাতৃভূমি ছেড়ে চলে এসেছ, আর কম্পিউটারের মাতৃভাষা নিয়ে মন খারাপ করার কী আছে!’

চাকরি হয়ে গেল। পিএইচডির কোর্সওয়ার্ক শেষ; ভাবলাম—থিসিসের কাজ ও চাকরি একই সঙ্গে চালিয়ে যাব।

কিছুদিন কাজ করার পর বুঝলাম, এই কাজ ফোরট্রানে হবে না। ম্যাপিং এবং গ্রাফিকস ডিসপ্লের জন্য যেসব লাইব্রেরি বা এপিআই দরকার, তা ফোরট্রানে নেই। বিপদে পড়ে গেলাম। ক্রিস্টিকে যদি বলি ফোরট্রানে এই কাজ হবে না, তাহলে নির্ঘাত চাকরি হারাব। এর মধ্যে জেনে গেছি, ড. ক্রিস্টি খুব একরোখা লোক। মনে মনে ভাবলাম—কাজটা যদি করতে না পারি, তাহলে তো এমনিতেই চাকরি হারাব। কাজ না করতে পেরে চাকরি হারানোর চেয়ে কাজটাকে এগিয়ে নিয়ে হারানো বরং সম্মানজনক।

কাজটা ‘সি’ ল্যাঙ্গুয়েজে করা শুরু করলাম। ক্রিস্টিকে মাঝেমধ্যে অগ্রগতি দেখাতে হয়। ডেমোর সময় বুকটা দুরুদুরু করতে থাকে। সৌভাগ্যের বিষয়, তিনি কখনো জানতে চাননি কোন ভাষায় প্রোগ্রাম করেছ? কাজ ভালো হচ্ছে তাতেই তিনি খুশি।

দুই বছর পার হয়ে গেল। আমার গ্রিন কার্ডও চলে এল। চাকরি হারালেও আর ভয় নেই। ক্রিস্টিকে একদিন গিয়ে বললাম, পুরো প্রজেক্টটা সি-তে করা হয়েছে। হেসে কিছু বলতে গিয়েও সে মনে হলো থমকে গেল। হয়তো বলতে চেয়েছিল, ‘সেটা তো আমি আগেই জানতাম’ কিংবা ‘তুমি দেখছি বড্ড অবাধ্য লোক!’

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *